
সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ—এই তিন উপজেলার জনগণের বহুদিনের দাবি চণ্ডিডহর সেতু নির্মাণের দাবিতে অবশেষে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। বুধবার (১২ নভেম্বর) তিন উপজেলার সচেতন নাগরিক ও তরুণ প্রতিনিধিদের উদ্যোগে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
তিন উপজেলার প্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসকের নিকট উপস্থিত হয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, চণ্ডিডহর নদীর উপর একটি সেতু না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রতিদিনের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এ সময় স্মারকলিপি প্রদানকারীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—মোঃ শাহীনুর পাশা, শাহ আজিজ, মকবুল হোসেন, আব্দুল হালিম, শিমুল চৌধুরী, জাকির হোসেন, কুতুব খান, পিয়ারুল ও আফজল প্রমুখ। তাঁরা জানান, জেলা প্রশাসকের বিনয়ী ও আন্তরিক মনোভাব তাদের মধ্যে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। উপস্থিত প্রতিনিধিরা বলেন, প্রশাসক যে সহানুভূতির সঙ্গে বিষয়টি শুনেছেন, তাতে মনে হচ্ছে চণ্ডিডহর সেতু নির্মাণের স্বপ্ন এবার বাস্তবায়নের পথে।
স্থানীয়রা জানান, চণ্ডিডহর নদী তিন উপজেলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করে। কিন্তু একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় বছরের পর বছর নৌকা ও সাময়িক ভেলা পারাপারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও করুণ হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগী, শিক্ষার্থী ও কৃষকদের পণ্য পরিবহনেও দারুণ ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই চণ্ডিডহর সেতু নির্মাণ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি তিন উপজেলার মানুষের জীবনের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
প্রায় ৫৫ বছর ধরে এলাকাবাসী এ সেতুর স্বপ্ন বুকে লালন করছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বহুবার বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন ও আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু সেতুটি নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। সম্প্রতি তরুণ প্রজন্মের উদ্যোগে নতুনভাবে আন্দোলনের ধারা শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহ আগে তিন উপজেলার মানুষ একত্র হয়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেন।
মানববন্ধনের ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি দেশব্যাপী বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচারিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার তিন উপজেলার তরুণ ও সচেতন নাগরিকেরা একত্রিত হয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকলিপি জমা দেন।
স্মারকলিপিতে তাঁরা উল্লেখ করেন, “চণ্ডিডহর সেতু নির্মাণ হলে তিন উপজেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে শুধু শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা সুবিধা লাভকারীরাই উপকৃত হবে না, বরং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতেও গতি আসবে। সামগ্রিকভাবে ভাটি জনপদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।”
তাঁরা আরও বলেন, “এ সেতু কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের তিন উপজেলার প্রাণের দাবি। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার ও প্রশাসন আমাদের এই ন্যায্য দাবিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন।”
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, চণ্ডিডহর নদী একসময় ছিল গ্রামীণ জীবনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ নদী এখন অনেকের কাছে ভোগান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতু না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হতে গিয়ে বহু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। তাই দ্রুত সেতু নির্মাণের দাবি এখন সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে।
স্মারকলিপি প্রদানের সময় প্রতিনিধিরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, প্রশাসকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তাদের আন্দোলনে নতুন গতি আনবে। তারা আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর চণ্ডিডহর সেতু নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করবে এবং ৫৫ বছরের পুরোনো এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ পাবে।
অবশেষে প্রতিনিধিরা বলেন, “চণ্ডিডহর ব্রিজ শুধু দিরাই, জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জের মানুষের দাবি নয়—এটি মানবতার দাবি, উন্নয়নের দাবি। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে এ দাবি বাস্তবায়নে শেষ পর্যন্ত কাজ করে যাব।”