পাবনা প্রতিনিধি
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় একসময়ের জমজমাট শুঁটকি শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে। দেশি মাছের তীব্র সংকট, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং নিষিদ্ধ জালের বেপরোয়া ব্যবহারে উপজেলার অধিকাংশ শুঁটকি চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। সীমিত পরিসরে চালু থাকা একটি চাতালেও উৎপাদন কমে আসায় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
এক সময় বর্ষা শেষে ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি চাতালগুলোতে কর্মব্যস্ততা শুরু হতো। নদী-খাল-বিল থেকে আসা দেশি মাছে ভরে উঠত চাতাল। মাছ পরিষ্কার, মাচায় শুকানো ও শুঁটকি প্রস্তুতের কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকতেন শ্রমিকেরা। উৎপাদিত শুঁটকি দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশের অন্তত ২০টি দেশেও রপ্তানি হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র পাল্টে গেছে।
সম্প্রতি উপজেলার কলকতি এলাকার একমাত্র চালু শুঁটকি চাতালে গিয়ে দেখা গেছে, সীমিত পরিমাণ মাছ নিয়ে কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক। অন্যান্য চাতাল বন্ধ থাকায় কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে কমেছে। শ্রমিক আসমা খাতুন বলেন, “আগে চাতালে কাজের অভাব ছিল না। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। এখন মাছ না থাকায় অধিকাংশ দিন কাজই থাকে না। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে গেছে।”
শুঁটকি ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী টানা দুই সপ্তাহেও মাছ পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে চাতাল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তার মতে, চলনবিল এলাকায় অপরিকল্পিত পুকুর খনন, অবৈধ জাল ব্যবহার ও নির্বিচারে মাছ শিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চাতালের মালিক মো. দুলাল হোসেন বলেন, “দিলপাশা, মাগুড়া, পুঁইবিল, তারাপুর, আদাবাড়িয়া, হাট উধুনিয়া, বাঁশবাড়িয়া, উধুনিয়া, দেখলগ্রাম ও দত্ত খারুয়া বিলে এক সময় প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মা মাছসহ সব ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে দেশি মাছের উৎপাদন ও প্রজনন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শুঁটকি উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ছালাম আলী ও আল-মাহবুদসহ কয়েকজন জানান, এক সময় বর্ষায় চলনবিলসহ ভাঙ্গুড়ার ছোট-বড় বিল পানিতে টইটুম্বুর থাকত। নদী ও খাল দিয়ে মাছ চলাচল করত। স্থানীয় জেলেরা প্রচুর দেশি মাছ আহরণ করতেন, যার বড় অংশ যেত শুঁটকি চাতালে। এখন জলাশয়ে পানি কমে যাওয়ায় এবং দেশি মাছের প্রাপ্যতা কমে আসায় সেই ব্যবসায় ভাটা পড়েছে।
মাগুর, চাপিলা, শিং, পাবদা, টাকি, চিতল, রিটা, গুজি, আইড়, কৈ, বোয়াল, খৈলসা, সরপুঁটি, গজার, বাইম, টাটকিনি, তিতপুঁটি, বাঘাইড়, গুলশা, কাজলি, গাং চেলা, টেংরা, মলা, কালবাউশ ও শোলসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ একসময় স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। এখন এসব মাছের অনেক প্রজাতি সহজে পাওয়া যায় না। স্থানীয় বাজারেও দেশি মাছের সরবরাহ কমেছে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল মোল্লা বলেন, “চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ নিধন এবং বৃষ্টি কম হওয়ায় জলাশয়ে পানি ও মাছ দুটোই কমেছে। অন্যান্য বছর যেখানে তিনটি শুঁটকি চাতাল ছিল, সেখানে এবার রয়েছে মাত্র একটি। গত বছর ৭ টন শুঁটকি উৎপাদন হলেও এ বছর ৪ থেকে ৫ টন উৎপাদন করাও কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, দেশি ও বিদেশি বাজারে শুঁটকির চাহিদা থাকলেও জলাশয়ে পর্যাপ্ত মাছ না থাকলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। চলতি বছর নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৭০৩টি চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস করা হয়েছে। নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদী-খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ-সড়ক নির্মাণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ না হলে দেশি মাছের সংকট আরও বাড়বে। এর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পও।