মঙ্গলে মহানগর কমিটি ও আমাদের গ্লোবাল নেতা।
আহমেদ হেলাল, আলোচক ও সমালোচক চ্যাপ্টির হাওর থেকে।
গ্লোবাল পলিটিক্স: যখন টোকিও মোড় আর প্যারিস পাড়া হয় একাকার------
শুক্কুর মিঞা ওরফে ‘শুক্কুর ভাই’ ফ্রান্সে আছেন আজ দশ বছর। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ট্যুরিস্টদের কাছে মিনি আইফেল টাওয়ার বিক্রি করাই তার কাজ। কিন্তু ফেসবুকে তার প্রোফাইল খুললে মনে হবে তিনি বোধহয় ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে সকালের নাস্তা সারেন। প্রোফাইল পিকচারে তিনি স্যুট-টাই পরে গম্ভীরে মুখে দাঁড়িয়ে, আর পেছনে বড় করে লেখা— "বাংলাদেশ জনকল্যাণ পার্টি, প্যারিস মহানগর শাখা। সাধারণ সম্পাদক: শুক্কুর মাহমুদ।"
একদিন তার বাল্যবন্ধু কাসেম তাকে মেসেঞ্জারে ধরল। কাসেম থাকে কুমিল্লার এক প্রত্যন্ত গ্রামে।
কাসেম: কিরে শুক্কুর, তুই প্যারিসে গিয়ে নাকি মহানগর কমিটির সেক্রেটারি হয়েছিস? তা প্যারিস মহানগরটা কি আমাদের চৌমুহনী বাজারের চেয়েও বড়? সেখানে কি তোদের মিছিল-মিটিং হয়?
শুক্কুর ভাই: (গলা ঝেড়ে) আরে কাসেম, তুই বুঝবি না। রাজনীতি হলো রক্তে। এখানে আমাদের সব আছে। প্যারিস মহানগর কমিটি, আইফেল টাওয়ার উত্তর শাখা কমিটি, এমনকি ‘লুভর মিউজিয়াম ছাত্র কমিটি’ও আমরা দিয়েছি গত মাসে।
কাসেম: ছাত্র কমিটি? কস কী ভাই! ঐখানে তোরা ছাত্র পাইলি কই? তোরা তো গেছিস কাজ করতে, কেউবা রেস্টুরেন্টে ডিশ ধুইস, কেউ ক্লিনার। তোরা আবার ছাত্র হলি কবে?
শুক্কুর ভাই: (একটু থমকে গিয়ে) আরে ছাত্র মানে কি শুধু স্কুলে পড়া? আমরা তো রাজনীতির ছাত্র! আর তাছাড়া কমিটির জন্য যখন লোক পাই না, তখন আমাদের ঐ যে সামসু মিঞার নাতি আছে না, যে রেস্টুরেন্টে বেল বয়-এর কাজ করে, ওরেই ‘প্যারিস মহানগর ছাত্রদলের’ সাংগঠনিক সম্পাদক বানাই দিছি। বয়স চল্লিশ হইছে তো কী হইছে? মনে তো ওর তারুণ্য!
লন্ডনের লবিং আর ইতালির ইশতেহার
শুক্কুর মিঞার সাথে কথা শেষ করে কাসেম দেখল তার আরেক বড় ভাই ‘রতন দা’র স্ট্যাটাস। রতন দা ইতালিতে থাকেন, কিন্তু তার পদবী আরও ভয়ঙ্কর— "ভেনিস শহর সমন্বয় কমিটির বিশেষ ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম-মহাসচিব।" কাসেম মনে মনে ভাবল, "শালা, ভেনিস শহরে তো রাস্তা নাই, সব পানি। সেখানে কি রতন দা নৌকা নিয়ে মিছিল করে? আর লুইসা পান্তা ভাতে কি মরিচ পোড়া দেয়?"
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে কাসেমের মাথা ঘুরে গেল। সে দেখল:
রিয়াদ মহানগর যুব কমিটি: যারা মরুভূমির বালুর ওপর দাঁড়িয়ে "এক দফা এক দাবি" জানাচ্ছে।
লন্ডন মহানগরী উপকমিটি: যেখানে লন্ডনের মেয়র সাদিক খান হয়তো টেরও পাননি যে তার নাক ডগায় "গ্রেটার লন্ডন জনসেবা দল"-এর কমিটি গঠন হয়ে গেছে।
টোকিও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল: যারা জাপানিজদের সুশি খাওয়া বাদ দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পরমাণু নয়, আমাদের চাই পথসভা!
সেদিন রাতে কাসেম স্বপ্ন দেখল। নাসা (NASA) মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠিয়েছে। সেই প্রথম রকেটে করে যখন মানুষ মঙ্গল গ্রহে নামল, দেখল সেখানে আগে থেকেই একজন বাঙালি নীল স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। রকেট থেকে নামা মহাকাশচারীকে দেখে বাঙালিটি একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিলেন।
কার্ডে লেখা: "সভাপতি, মঙ্গল গ্রহ মহানগর কেন্দ্রীয় কমিটি।"
মহাকাশচারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনারা এখানে পরমাণু গবেষণা করছেন? নাকি নতুন কোনো বিজ্ঞানের আবিষ্কার?"
বাঙালি নেতা দাঁত বের করে হাসলেন, "আরে না ভাই! জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে কী হবে? আগে কমিটিটা শক্ত করতে হয়। আমরা এখানে এলিয়েনদের নিয়ে ‘উপগ্রহ শাখা কমিটি’ করার কথা ভাবছি। লুলু হাইপার মার্কেট থেকে কিছু এলিয়েনকে পকেটস্থ করতে পারলেই কেল্লাফতে!"
উপসংহার: আমাদের রাজনীতিই আমাদের পৃথিবী
আসলে বাস্তবতা হলো, আমরা মিসাইল বানাতে না পারি, কমিটি বানাতে আমাদের জুড়ি নেই। হলিউড আমাদের চেনে না, বলিউড আমাদের চেনে না, এমনকি বিজ্ঞানের খাতায় আমাদের নাম হয়তো সবার শেষে। কিন্তু কোনো এক অচেনা দেশের গলি তস্য গলিতে যদি দুজন বাঙালি থাকে, তবে নিশ্চিত থাকুন সেখানে তৃতীয় জন গেলেই একটা 'কমিটি' গঠিত হবে।
সেখানে কোনো কূটনীতি কাজ করুক আর না করুক, "সিলেট টু সিডনি" আর "বরিশাল টু বার্লিন"—আমাদের রাজনীতির ঝাণ্ডা উড়বেই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, জীবন মানেই এক একটা কমিটি, আর উন্নত জীবন মানেই—প্রবাসে বসেও দেশের 'মহানগর কমিটির' স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুকে লাইক কুড়ানো!
আহমেদ-হেলাল আলোচক ও সমালোচক। দিরাই চ্যাপ্টির হাওর থেকে।