জামালগঞ্জ(সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীর আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেই সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। উৎসবের আনন্দ, পূজার ঢাকের শব্দ আর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই হারিয়ে গেল একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোরে পাশের নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৯ বছর বয়সী শিশু অদিতি রায় ঐতির মরদেহ। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিহত অদিতি রায় ঐতি উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের মনোজ রায় ও রুবি রায় দম্পতির মেয়ে। মাত্র ৯ বছর বয়সে তার এমন অকালমৃত্যুতে শোকাহত পুরো গ্রাম। যে বয়সে হাসি-আনন্দ, খেলাধুলা আর পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই বয়সেই নিভে গেল ছোট্ট অদিতির জীবনপ্রদীপ।
সন্ধ্যায় নিখোঁজ, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রাত কাটে পরিবারের
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীর দিন আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার দিকে অদিতি রায় ঐতিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও তার কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। প্রথমে বাড়ির আশপাশে ও পরিচিত বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করা হয়। পরে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় শিশুটিকে খুঁজতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা।
সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও অদিতির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সময় যত গড়াতে থাকে, পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ততই বাড়তে থাকে। প্রিয় সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় রাতভর খোঁজাখুঁজি চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো সুখবর মেলেনি।
ভোরে নদীতে ভাসতে দেখা যায় শিশুটির মরদেহ
বুধবার ভোর আনুমানিক ৫টা ১৫ মিনিটের দিকে দুর্গাপুর গ্রামের পাশের নদীতে শিশুটির মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পুলিশকে জানানো হলে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের ধারণা, পানিতে ডুবে শিশুটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানকে হারানোর এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোক ও কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে দুর্গাপুর গ্রামের পরিবেশ। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারাও শিশুটিকে শেষবারের মতো দেখতে ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন।
ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়িতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা
শিশুটির মৃত্যুর খবর পেয়ে বুধবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়িতে উপস্থিত হন জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রাণী মোদক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার, ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায়।
এ সময় তাঁদের সঙ্গে আনসার বাহিনীর সদস্য, তিনজন ইউপি সদস্য এবং গ্রাম পুলিশের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এমন অপূরণীয় ক্ষতির সময়ে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তাঁরা। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে মরদেহ দাহ করার বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে শিশুটির মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো বিষাদে
শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। মহানবমী উপলক্ষে যখন পূজামণ্ডপে পূজা-অর্চনা, ভক্তদের আনাগোনা এবং উৎসবের নানা আয়োজন চলছিল, তখন দুর্গাপুর গ্রামের একটি পরিবারে নেমে আসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন শোক।
চারদিকে উৎসবের আমেজ থাকলেও মনোজ রায় ও রুবি রায়ের পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর শূন্যতা। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল তাঁদের স্বপ্ন, আশা ও ভালোবাসা, সেই সন্তানকে আর কখনো ফিরে পাবেন না তাঁরা। ছোট্ট অদিতির অনুপস্থিতি পরিবারের প্রতিটি মুহূর্তে গভীর শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করেছে।
গ্রামবাসীর কাছেও অদিতির এই মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি শিশুর অকালপ্রয়াণ শুধু তার পরিবারকেই নয়, পুরো এলাকার মানুষকে শোকাহত করেছে। উৎসবের আনন্দের মাঝেও দুর্গাপুর গ্রামের মানুষের মনে এখন বিষাদের সুর।
একটি শিশুর মৃত্যু, রেখে গেল অসংখ্য বেদনাময় প্রশ্ন
মাত্র ৯ বছরের অদিতি রায় ঐতির এমন মৃত্যু স্থানীয় মানুষের মনে গভীর বেদনার পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কীভাবে শিশুটি নিখোঁজ হলো, কী পরিস্থিতিতে নদীতে তার মরদেহ পাওয়া গেল এবং ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া জরুরি।
তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুর গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, শোকসন্তপ্ত পরিবারটি যেন এই কঠিন সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় এবং শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দের মাঝে অদিতি রায় ঐতির এই অকালপ্রয়াণ দুর্গাপুর গ্রামকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর বিদায়ে শোকাহত পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী।