
সুনামগঞ্জ—একসময় যে মাটি ধন্য হয়েছিল আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর মতো প্রাজ্ঞ ও জনদরদী নেতাদের পদচারণায়। যে জনপদের মানুষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ‘ছায়া’ মনে করে শ্রদ্ধা করত, আজ সেই জনপদেই রাজনীতি যেন এক আতঙ্কের নাম।
৫ই আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—নেতাদের ‘খাই খাই’ স্বভাব আর পকেট ভারী করার নেশায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন।থানা নাকি রাজনৈতিক উৎসব কেন্দ্র? সুনামগঞ্জের বিভিন্ন থানাগুলোতে এখন সাধারণ মানুষের চেয়ে রাজনৈতিক নেতাদের দাপট বেশি।
একজন সাংবাদিকের চোখে ধরা পড়েছে চাঞ্চল্যকর চিত্র। সন্ধ্যা নামার আগেই ওসি সাহেবের রুমে ভিড় জমে তথাকথিত নেতাদের। সেখানে ন্যায়ের চেয়ে ‘তদবির’ বড় হয়ে দাঁড়ায়। “উনি আমাদের দলের লোক”, “উনি অমুক নেতার ভাই”—এমন সব দোহাই দিয়ে অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা চলে প্রতিনিয়ত। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রাজনৈতিক টেলিফোনের চাপে রীতিমতো দিশেহারা।
প্রশ্ন উঠেছে, থানা কি জনগণের ভরসাস্থল নাকি রাজনৈতিক উৎসব কেন্দ্র?পারিবারিক বিবাদেও নেতাদের হস্তক্ষেপ বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুধু সরকারি অফিস বা থানায় সীমাবদ্ধ নেই। একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিবাদও এখন নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম সংকটে রয়েছেন।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সামান্য বিষয়েও নেতারা নিজেদের ‘অধিকার’ প্রয়োগ করেন শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ আর আধিপত্য বজায় রাখতে।অদৃশ্য আয়ের উৎস ও ‘আলাদীনের চেরাগ’ রাজনীতিবিদদের কি কোনো নির্ধারিত বেতন আছে? নেই। অথচ সুনামগঞ্জের রাজপথে হঠাৎ উদয় হওয়া নতুন নেতাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন দেখলে চোখ কপালে ওঠে। মাদক ব্যবসা, বালু মহাল দখল, হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, ভারতীয় মালামাল চোরাচালান থেকে শুরু করে ফসলি জমির মাটি কাটা—সব জায়গাতেই রয়েছে নেতাদের ‘আশীর্বাদী’ হাত। রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার এই নেশা যেন কোনো এক ‘আলাদীনের চেরাগ’ পাওয়ার মতো।
সাদা চামড়ার আড়ালে কালো কারবারিদের এই দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে।ইতিহাস বনাম বর্তমান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কি এমন এক বাংলাদেশের জন্য হয়েছিল যেখানে একদল মানুষ সব সুযোগ ভোগ করবে আর সাধারণ মানুষ শোষিত হবে? সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তানদের কথা স্মরণ করে স্থানীয়রা বলছেন, “আগের নেতারা ছিলেন মানুষের রক্ষক, আর এখনকার অনেকে হয়েছেন ভক্ষক।” নেতাদের দেখলে এখন সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা তো দূরে থাক, ভয়ে এড়িয়ে চলে।
আড়ালে চলে অভিশাপ আর গালমন্দ।এখনই সময় শুদ্ধি অভিযানের নবাগত প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সিনিয়র নেতৃবৃন্দের প্রতি জেলার সচেতন নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের আকুল আহ্বান—আপনাদের মাঠপর্যায়ের নেতাদের আমলনামা যাচাই করুন।
তাদের আয়ের উৎস কী? কেন তারা সরকারি কাজে ‘বাম হাত’ ঢুকাচ্ছেন?সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। যদি রাজনীতি শুধু ব্যক্তিস্বার্থ আর শোষণের মাধ্যম হয়, তবে সাধারণ মানুষের বাস করার জায়গা কোথায়? সময় এসেছে এই ‘রাজনৈতিক নৈরাজ্য’ বন্ধ করে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার।