
সাব এডিটর আবু তাহের মিসবাহ :
সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের অন্তর্গত হকনগর এলাকায় প্রায় ৭০ লাখ টাকার একটি পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটি হকনগর পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির অধীনে বাস্তবায়নাধীন। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে কাজের মান নিয়ে একাধিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে, যা নিয়ে এলাকাজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দে একটি ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাশতলা, হকনগরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শতাধিক কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সমস্যার সমাধান হবে—এমন আশায় কৃষকরা প্রকল্পটি ঘিরে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
পরিদর্শনে দেখা যায়, ড্রেনের বিভিন্ন অংশে আরসিসি ঢালাই ফেটে গেছে। যেখানে ২ ইঞ্চি কার্নিশ থাকার কথা, সেখানে রড বের হয়ে থাকতে দেখা যায়। একাধিক স্থানে ঢালাইয়ের কাজ সঠিকভাবে কমপ্যাক্ট না করায় ফাঁপা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আরসিসি ঢালাইয়ের সময় ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার করা হয়নি, ফলে কংক্রিটের ভেতরে ফাঁকা অংশ থেকে যাচ্ছে এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফাটল দেখা দিচ্ছে।
এছাড়া ড্রেনের ওয়াটার লেভেল সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও সেন্টার ফিলিং ও টেম্পারিং যথাযথভাবে করা হয়নি। বেইস ঢালাই মানসম্মত নয় বলে দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মানের বালুর পরিবর্তে নিম্নমানের বিট বালু ব্যবহার করা হয়েছে। পর্যাপ্ত রড ব্যবহার না করা এবং দেয়ালে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট না দেওয়ার কারণেই কাজ চলমান অবস্থাতেই ফাটল ধরছে বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
উক্ত পানি উন্নয়ন সমিতির সদস্য শাহজাহান মোল্লা বলেন,“শুরু থেকেই ঢালাইয়ের সময় ঠিকমতো পানি দেওয়া হয়নি। রড ও সিমেন্টের ব্যবহারও ছিল অপর্যাপ্ত। ওয়াটার লেভেলও ঠিক রাখা হয়নি।”
সমিতির আরেক সদস্য ফজলুর রহমান বলেন,
“যেখানে ২.৫ ইঞ্চি সাইড কভার থাকার কথা, সেখানে অনেক জায়গায় রড বের হয়ে আছে। কাভারিং ঠিকমতো হয়নি।”
কলোনি গ্রামের রাজমিস্ত্রী আব্দুস সামাদ বলেন,
“আমি নিজেও রাজমিস্ত্রী। ইঞ্জিনিয়ারিং মানদণ্ডে বিচার করলে এই কাজকে সঠিক কাজ বলা যাবে না।”
জুমগাঁও গ্রামের ইছরাক চৌধুরী অভিযোগ করেন,
“সরকারি ম্যানুয়াল অনুযায়ী কোনো কাজই করা হয়নি। এত অনিয়ম হয়েছে যে বলার মতো ভাষা নেই।”
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি হারুনর রশীদ বলেন,
“বালু, পাথর, সিমেন্ট, রড—কোনোটাই ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। কাজের দুইদিন পরই বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে।”
প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকে সরাসরি কাজ বন্ধের দাবি জানান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ তদারকি ছাড়াই নিম্নমানের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
এ বিষয়ে হকনগর পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি আনোয়ার ভুইয়া এই আমাদের প্রতিনিধিকে জানান,
“কাজে অনিয়ম ও ত্রুটি দেখা যাওয়ার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। প্রকৌশলী সরাসরি উপস্থিত হয়ে পরিদর্শন না করা পর্যন্ত আপাতত কাজ বন্ধ থাকবে। কৃষক ও সাধারণ জনগণের দাবির সঙ্গে আমরা একমত।”
দোয়ারাবাজার উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বলেন বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি সরজমিনে পরিদর্শন করে যেখানে সমস্যা হবে সেখানে সমাধান করা হবে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার চৌধুরী আহসান পারভেজ। তিনি জানান, কাজে কোনো অনিয়ম ও দূর্নীতি হয়নি।
কাজ বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের মিস্ত্রী চলে আসায় কাজ বন্ধ আছে। শিঘ্রই আবার কাজ শুরু হবে।”
একই ভাষ্য এলজিইডির দোয়ারাবাজার উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী জসীম উদ্দিনের। তিনি বলেন, “যারা অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। যারা অভিযোগ করেছে যোগাযোগ করে তাদেরকে কাউকে পাইনি। কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম দূর্নীতি হয়নি। ম্যানুয়াল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।