1. sylhetersangram2025@gmail.com : sylhetersangram :
ভাটির জনপদে ৪ প্রজন্মের জনপ্রিয় ডাক্তারের নাম রসেন্দ্র কুমার তালুকদার - sylhetersangram
৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| শনিবার| সকাল ৮:১৬|
Title :
মাদকবিরোধী অভিযানে সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার ছাতকের বৃহত্তর ঝিগলীতে যুবকের মৃত্যু নিয়ে ধুম্রজাল ম্যানচেস্টারে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী পালিত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন দিরাইয়ে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ: প্রতিবেশীর হামলায় তরুণী খুন, আহত ১ দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডাঃ শংকর চন্দ্র দাস আর আমাদের নেই। ঈদে পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে শাবিপ্রবি প্রশাসন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সিলেটবাসীসহ দেশ ও বিদেশের সকল মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক জানিয়েছেন মতো মতো মহানগর ছাত্রদল নেতা মাহমুদুল হাসান সাগর পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা এম সাইফ উদ্দিন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে চরমহল্লা ইউনিয়নবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন তালুকদার

ভাটির জনপদে ৪ প্রজন্মের জনপ্রিয় ডাক্তারের নাম রসেন্দ্র কুমার তালুকদার

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, মে ২২, ২০২৬,
  • 125 Time View

আল হেলাল,সুনামগঞ্জ :

 

কলকাতার ডা: বিধান চন্দ্র রায় রোগীর মুখ দেখেই যেমন রোগীর রোগ বুঝতে পারতেন। তেমনি ভাটির জনপদ দিরাই উপজেলায়ও এরকম একজন চিকিৎসক ছিলেন। রোগীর চোখ মুখ এবং কণ্ঠস্বর যাকে বলে দিত তিনি কোন রোগে ভূগছেন। দিরাই উপজেলার সেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও মানবিক চিকিৎসক ছিলেন ডাঃ রসেন্দ্র কুমার তালুকদার (যিনি রসেন্দ্র কুমার কাকু নামেও পরিচিত) আজ তিনি আর বেঁচে নেই। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল বিকেলে দিরাই পৌরশহরের আনোয়ারপুরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

জীবনভর গরিব ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে এবং অত্যন্ত কম ফি-তে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য তিনি ‘মানবিক ডাক্তার’ হিসেবে দিরাই ও শাল্লা অঞ্চলে অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। দিরাই শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমসহ অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অন্যতম কারিগর তিনি। তাঁর মৃত্যতে দিরাই তথা হাওর বাসী এক কিংবদন্তি চিকিৎসককে আজীবনের জন্য হারালো। দাদা পিতা পুত্র দৌহিত্র ভাটির জনপদের এই ৪ প্রজন্মের একজন জনপ্রিয় ডাক্তার ছিলেন তিনি। তাঁর জীবদ্ধশায় এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির একজন লেখক আশরাফ আহমেদ তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। আমি তাঁর একটি ভিডিও ইন্টারভিউ করেছিলাম। অনেকদিন পর সেই হারানো ভিডিওটি ফিরে পেয়ে তা উপস্থাপনের চেষ্টা করলাম।

 

 

“ ডা. রসেন্দ্র কুমার তালুকদার। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা তথা ভাটি এলাকার মানুষের কাছে আশীর্বাদপুষ্ট এক নাম। ভাটির মানুষের কাছে যিনি রূপকথার গল্পের মতোই বেঁচে রবেন। হাওর পাড়ের মানুষের কাছে যার গল্পগুলো অমরত্ব পাবে যতদিন বয়ে যাবে রূপ লাবণ্যের কালনী নদী।

 

উচ্চ-মধ্য কিংবা নিম্নবিত্ত, সব শ্রেণির মানুষের কাছেই আস্থা আর বিশ্বাসের প্রতীক ডা. রসেন্দ্র কুমার। চিকিৎসা সেবায় অনন্য এক দৃষ্টান্ত তিনি। অর্ধশত বছর ধরে মানুষের জীবন আলোকে সুস্থ, নিরাপদ, আর সুন্দর রাখতে বিরামহীনভাবে মস্তিষ্কটা চালিয়ে যাচ্ছেন ভাটির এই কিংবদন্তি চিকিৎসক।

ডা. রসেন্দ্র কুমার তালুকদার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার (শান্তিগঞ্জ) দুর্গাপাশা ইউনিয়নের বীরকলস (চৌকা) গ্রামে ১৯৪৬ সালের পহেলা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যতার মাঝে শৈশব কাটলেও থেমে থাকেননি দিরাইয়ের মানুষের কাছে দেবী শেঠি খ্যাত রসেন্দ্র তালুকদারের পড়াশোনা। ৪ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বাবা মায়ের মেজো ছেলে।

 

 

কষ্টেসৃষ্টে বড় হওয়া রসেন্দ্র ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। মূলত পিসির বাড়ি দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের লৌলারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি

পরে দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সবগুলো পরীক্ষায় ফার্স্টক্লাস পেয়ে ১৯৬৩ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরে আইএসসিতে (এইচএসসি) সুনামগঞ্জের বর্তমান সরকারি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ভর্তি হবার পর বেতন, বই, ফিসহ গৌরারং এলাকার নগেন্দ্র চৌধুরীর বাসায় থাকার ব্যবস্থা হয় তার। ফার্স্ট ডিভিশনে আইএসসি পাসের পর সিলেট মেডিকেলে (তৎকালীন নাম) ভর্তির একান্ত ইচ্ছে হয়, কিন্তু টাকার অভাবে হিমশিম খাচ্ছিলেন। পরে আইএসসিতে আবারো স্কলারশীপ পেয়ে ১৯৬৫ সালে ভর্তি হন সিলেট মেডিকেলে (বর্তমান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল)। এ সময় কর্তৃপক্ষ তার বই, খাতা, বেতন মওকুফ করে দেন। সেখানে তাকে শিক্ষানুরাগী শহীদ প্রফেসর ডা. বিমলাংশু সেনগুপ্ত (পচুসেন) তার নিজ বাসায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং সকল ব্যয়ভারের দায়িত্ব্ব বহন করেন।

ছাত্রাবস্থায় তিনি, সিলেট মেডিকেলের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. বিমলাংশু সেনগুপ্তের শতভাগ সহযোগিতা পান। বিমলাংশু সেনগুপ্তের বিশাল অবদানের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিলেট মেডিকেলের অধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান, আমিনুর রশীদ চৌধুরী (সাবেক স্পিকার মরহুম হুমায়ুন রশীদের ভাই) বিমলাংশু সেনগুপ্তসহ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী।

 

আমিনুর রশীদ চৌধুরীকে ছেড়ে দিলেও সেইদিন অধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান, বিমলাংশুকে হত্যা করা হয়। ডা. রসেন্দ্র বলেন, সেই দিনটি ছিল আমার জীবনের অত্যন্ত কষ্টের দিন। স্বপ্ন পূরণে অনেকের সহযোগিতা পেয়েছি জানিয়ে তিনি বলেন, শহীদ বিমলাংশু স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন, ওনার বাসায় আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাসহ সমস্ত ব্যয়ভার বহন করে নেন। উনি বলতেন, তোমাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা পাঠাবো, তোমাকে অনেক বড় হতে হবে। উনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমি আমেরিকায় পড়াশুনার সুযোগ পেতাম। কিন্তু সেই সুযোগটি আর পেলাম না। ডা. রসেন্দ্র বলেন, তখনকার সময়ে এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. আব্দুল খালেক স্যারের সান্নিধ্যও পেয়েছি।

 

 

অবাক করার বিষয় হলো, ‘শিক্ষাজীবনের’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘রেকর্ড প্রথম স্থানটি’ ছিল তার অধীনস্তই। বরাবরই ক্লাসের ফার্স্টবয় ছিলেন প্রথিতযশা এই চিকিৎসক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার শিক্ষাজীবনে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বলতে কোনো শব্দ আসেনি। সব পরীক্ষাতেই প্রথম হয়েছি।

দিরাইয়ের স্বনামধন্য এই চিকিৎসক একজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। প্রচারবিমুখ হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে তার বিশাল অবদানের কথা অনেকেই জানেন না।

 

১৯৭১ সালে তিনি যখন মেডিকেলের ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থী তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় তিনি পালিয়ে না গিয়ে জন্মমাটিকে রক্ষার সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি তার চিকিৎসাসেবাটি কাজে লাগানোর বাসনা থেকে চলে যান ভারতের ১৬নং মইলাম ক্যাম্পে। সেখানে শরণার্থী ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় যোগ দেন। তখন হাসপাতালের প্রধান ছিলেন দিরাইয়ের এলংজুরী গ্রামের ডা. সতীশ চন্দ্র দাস। সেখানেও তিনি নিজের দক্ষতার দরুণ কর্তৃপক্ষের সুনাম কুড়িয়ে নেন। দেশের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যান দিরাইয়ের এই চিকিৎসক। পরে কাজে মুগ্ধ হয়ে তাকে শরণার্থী ক্যাম্পটির প্রধান চিকিৎসকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখানে তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা সেবায় নিষ্ঠার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, পরবর্তীতে তার এই কৃতিত্বের কথা অনেক মুক্তিযোদ্ধার সুরেই শোনা যাচ্ছিল।

 

 

মুক্তিযুদ্ধে গুরূত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও কোনো স্বীকৃতি চাননি নিভৃতচারী এই ডাক্তার। এজন্য তার কোনো ধরনের আক্ষেপও নেই। বরং দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছেন তাই ছিল গর্বের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার কাছে দেশ আর মা একই জিনিস। ৭১ সালে মায়ের জন্য কাজ করেছি, এটাই বড় তৃপ্তির বিষয়। স্বীকৃতি দিয়ে কী হবে?

১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে মেডিকেল ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমান ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চাকরি পেয়ে যান। ১৯৭৩ সালে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) হিসেবে নবীগঞ্জ সদর হাসপাতালে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে আবারো সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার (ই.এম.ও) হিসেবে যোগ দেন।

 

 

১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে দিরাই সদর হাসপাতালে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। তখনকার দিরাইয়ে নগণ্য স্বাস্থ্য সেবাকে এগিয়ে নিতে দুই বছর একাই নিরলস সেবা দিয়ে যান। তার প্রচেষ্টায় পরবর্তী সময়ে হাসপাতালটিতে ২-৩ জন চিকিৎসক আসেন। পরে অনেকটা রূগ্নতা কাটিয়ে ৮ বছরেই প্রাণ ফিরিয়েছিলেন অবহেলিত দিরাই হাসপাতালটিকে। র্কমজীবনে অব্যাহত সফলতায় ১৯৮৩ সালে আবারো প্রমোশনের লেটার আসে মাদারীপুর জেলার সাব ডিভিশন মেডিকেল অফিসার (এস.ডি.এম.ও) হিসেবে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলিত দিরাইয়ের মানুষের কথা ভেবে পদন্নোতির সেই সুযোগটি তিনি ফিরিয়ে দেন। আলিসান জীবন আর উচ্চ চেয়ারের লালসায় না জড়িয়ে জরাজীর্ণ দিরাইয়েই থেকে যান। এখানে যোগদানের ৮ বছর পর ১৯৮৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান।

তখনকার সময়ে সুনামগঞ্জ তথা দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসকের মধ্যে তার নামটিও অনেকের সুরেই চলে আসতো। ৮০ দশকের দিকে চিকিৎসার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগীরা তার কাছে ছুটে আসতেন। বিশেষ করে ভাটি এলাকার মানুষের এরকম একটা ধারণাই তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, ‘রসেন্দ্র ডাক্তারের কাছে না গেলে রোগ সারতো নায়’। মধ্যরাতে রোগী নিয়ে আসলেও তিনি কখনো তা ফিরিয়ে দিতেন না। যে কারণে অসুস্থ হলে রসেন্দ্র ডাক্তারই ছিলেন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে আস্থা বিশ্বাস আর ভরসার নির্ভরযোগ্য জায়গা। এরপরও তিনি নিজেকে কখনো বড় করে ভাবেননি। ভাটির সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি বরাবরই হাতের নাগালের মধ্যে রেখেছেন। বিভিন্ন সময়ে রোগীর ভিজিট (চিকিৎসা ফি) বাড়ানোর জন্য অন্যান্য ডাক্তার ও নানা জায়গা থেকে অনুরোধ আসলেও তিনি কখনোই সেগুলো আমলে নেননি। দেশের অধিকাংশ চিকিৎসকই যখন বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। রোগীদের বাড়তি ওষুধ, টেস্ট দিয়ে কোটি কোটি টাকা বাড়তি ইনকাম করেন। সেই জায়গায় ডা. রসেন্দ্র বরাবরই এসব লোভনীয় অফার বর্জন করে গেছেন।

১০ টাকা ভিজিট থেকে ৪০, ৬০, ১০০, ২০০ দিয়ে চিকিৎসা করেছেন। সর্বশেষ কিছুদিন আগে সর্বোচ্ছ ৩০০ টাকা করা হয়েছিল। এটাও নির্ধারিত থাকতো না। যখন যার যতো খুশি ততোই দিতেন। টাকার দিকে না তাকিয়ে রোগীদের আন্তরিকতার সঙ্গেই চিকিৎসা করে দিতেন নামমাত্র স্বল্পমূল্যে এতো ভালোমানের চিকিৎসাসেবা ভাটি এলাকার মানুষ আর কোথাও কখনো পায়নি। পাবেও না।

স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিয়ে ভাটির জনপদে আশীর্বাদ পুরুষ হয়ে আগমন হওয়া জীবন্ত এই কিংবদন্তিকে ভাটি এলাকার দেবী শেঠি বলেও সম্বোধন করা হয়। ২০২১ সালের ৬ই এপ্রিল দিরাইয়ে কিংবদন্তি এই ডাক্তারের চিকিৎসা জীবনের ৪৫ বছর পূর্ণ হয়।

তার স্ত্রী নমিতা রানী তালুকদার দিরাই মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পর রাজানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ স্কুল থেকেই অবসরে যান তিনি। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন খুবই নিষ্ঠাবান। বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কখনো ছুটি কাটাননি। ২০০৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রী নমিতা রানী তালুকদারকে একজন আদর্শ স্ত্রী উল্লেখ করে ডা. রসেন্দ্র তালুকদার বলেন, তিনি ছিলেন সৎ কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। সফল এই দম্পতির কোনো সস্তান ছিল না। তাতেও কোনো আক্ষেপ ছিল না তাদের। আত্মীয়স্বজনের সন্তানদের নিজের সন্তান মনে করেই সুশিক্ষিত করেছেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ অনেককেই সফল করে তাদেরকে আলোকিত মানুষ তৈরি করে দিয়েছেন এই দম্পতি।

পেশাদারিত্বের সবই যেমন মানুষের কল্যাণে নিবেদিত করেছেন তেমনি অর্জিত সবকিছু মানবকল্যাণেই বিলিয়ে দিয়েছেন নিভৃতচারী প্রচার বিমূখ সফল এই দম্পতি। নিজের ও শিক্ষিকা স্ত্রীর সকল অর্জন দান করে প্রতিষ্ঠা করেছেন হাওরাঞ্চলের মধ্যে অন্যতম ধর্মীয় উপাসনালয় রামকৃষ্ণ মিশন। যেখানে পিছিয়ে পড়া গরিব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। স্ত্রী নমিতা বিপণী বিতান নামে ২৭ কোটার মার্কেটটিও তিন ভাইয়ের সন্তানদের নামে সমানভাবে বণ্টন করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সবকিছুই মানব কল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার বলতে কিছুই রাখিনি, সব সম্পত্তি ভাই ভাতিজাদের নামে বণ্টন করে দিয়েছি।

নিভৃতচারী এই চিকিৎসক ডায়বেটিসসহ শারীরিকভাবে বিভিন্ন রোগে অসুস্থ হলেও তার রোগীদের কখনো তা বুঝতে দেন না। প্রবীণ এই ডাক্তারের চার চারটি অপারেশন করা হয়েছে। ডাক্তাররা অনেক বছর আগেই চিকিৎসা থেকে বিরতি দিয়ে অবসরে যাওয়ার জন্য বললেও, তিনি তা করেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৮০ বছর বয়সেও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি আশা -ভরসার স্থল হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন।

২০২১ সালে ৬ই এপ্রিল দিরাইয়ে চিকিৎসা সেবায় ৪৫ বছর পূর্ণ করেন ভাটির এই কিংবদন্তি ডাক্তার। ৮০ বছর বয়সে এসেও থেমে থাকেননি তিনি। নিজের শারীরিক অবস্থা সমন্ধে তিনি বলেন, ভালো নেই তবে বেঁচে আছি বেশ, রোগীদের সেবাই আমার ধর্ম। তিনি বলেন, আমার কাছে রোগীর সেবাই তো মূল ধর্ম। কাজ করলেও মরবো, না করলেও মরবো।’

ধৈর্য্যের সমান গুণ নাই, সন্তোষ সমান ধর্ম নাই ২. যথ মত, তথ পথ ৩. কাজ করলেও মরবো না করলেও মরবো’ উল্লেখ করে ডা. রসেন্দ্র বলেন, তাই জীবনে এই ৩টি বাণীকে ধারণ করেই চলছি।

ডা. রসেন্দ্র বলেন, জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, মানুষের আশির্বাদ ও ভালোবাসা। এগুলো সবার কপালে জোটে না। সেই জায়গায় আমি সৌভাগ্যবান। অগণিত মানুষের এই ভালোবাসা আর আশির্বাদে থেকেই মরতে চাই, বলছিলেন ডা. রসেন্দ্র।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। স্বত্ব © ২০২৫ সিলেটের সংগ্রাম