
শান্তিগঞ্জে নূর ইসলামের একক রাজত্ব: সরকারি মাটি লুট ও খাস জমি বরাদ্দের নামে হরিলুট!
মোঃ রেজাউল করিম রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৫নং পাথারিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের হাসারচর (আমদাবাদ) গ্রামে সরকারি আইন ও স্থানীয় প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে এক ব্যক্তির একক রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে। গ্রামের আমদাবাদ মৌজার সরকারি পতিত জমি ও কিশোর-যুবকদের একমাত্র খেলার মাঠ থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি এবং ভুয়া ভূমিহীন সাজিয়ে ঘর নির্মাণের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে নূর ইসলাম নামক এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত নূর ইসলাম ওই গ্রামের আরজু মিয়া কাবুলির ছেলে।
খেলার মাঠ ও পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নূর ইসলাম প্রতি বছরের মতো এ বছরও গ্রামের একমাত্র খেলার মাঠ ও পার্শ্ববর্তী সরকারি পতিত জায়গা থেকে ‘বেকু’ (এস্কাভেটর) দিয়ে দেদারসে মাটি তুলে বিক্রি করছেন। এর ফলে মাঠটি বিশাল গর্তে পরিণত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। সরেজমিনে মাটি কাটার চালকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, নূর ইসলামের নির্দেশেই তারা এই খননকাজ চালাচ্ছেন।
আইনি বিশ্লেষণ:
সরকারি সম্পত্তি থেকে এভাবে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি কাটা ‘বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’-এর সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। উক্ত আইনের ৪ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কোনো সরকারি বা খাস জমি থেকে মাটি বা বালু উত্তোলন করা যাবে না। ১৫ ধারায় এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
‘দশ হাজারি’ বাণিজ্যে ভুয়া ভূমিহীন সিন্ডিকেট
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সরকারি জায়গায় ঘর নির্মাণের নামে অর্থ আদায়ের বিষয়ে। নূর ইসলাম স্থানীয় কিছু সচ্ছল ব্যক্তিকে ‘ভূমিহীন’ সাজিয়ে সরকারি খাস জায়গায় ঘর তুলে দিচ্ছেন। বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা করে নিচ্ছেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, সংগৃহীত টাকা মসজিদে দান করার কথা বলা হলেও এটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত চাঁদাবাজি।
গ্রামবাসীর মনে প্রশ্ন:
১. কার নির্দেশে বা কোন আইনি ক্ষমতাবলে তিনি সরকারি জায়গায় ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন?
২. যাদের ভূমিহীন সাজানো হয়েছে, তারা কি আসলেই ভূমিহীন নাকি নূর ইসলামের সিন্ডিকেটের লোক?
৩. যথাযথ যাচাই-বাছাই ও বন্দোবস্ত ছাড়া সরকারি জায়গায় ভিটি করার অনুমতি তাকে কে দিল?
প্রশাসনের এখতিয়ার বনাম ব্যক্তিগত আধিপত্য
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সরকারি খাস জমি বা পতিত জমি রক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও বণ্টনের একক দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর। কোনো ব্যক্তি বিশেষের একক সিদ্ধান্তে কাউকে ভূমিহীন ঘোষণা করা বা জমি বরাদ্দ দেওয়া আইনত অসম্ভব।
নূর ইসলামের এই কর্মকাণ্ড সরাসরি ‘দণ্ডবিধি (Penal Code), ১৮৬০’-এর ৪৪৭ (অবৈধ অনুপ্রবেশ) এবং ৪২৭ (সম্পত্তির ক্ষতিসাধন) ধারার আওতাভুক্ত। এছাড়া সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা ‘সরকারি সম্পত্তি (উচ্ছেদ) অধ্যাদেশ, ১৯৮৫’ অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা ও এলাকাবাসীর ক্ষোভ
গ্রামের সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, নূর ইসলাম আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে গ্রামের অবশিষ্ট খালি জায়গাগুলোও ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাবে। ভুয়া ভূমিহীন সাজিয়ে জমি দখলের এই প্রবণতা এলাকায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
সরকারি সম্পত্তি কি তবে ব্যক্তিবিশেষের আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে?—এই প্রশ্ন এখন আমদাবাদ মৌজার ঘরে ঘরে। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যেন সরজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে নূর ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একই সাথে ভুয়া ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে সরকারি সম্পত্তি ও খেলার মাঠটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই অবৈধ দখলদারিত্ব গ্রামটিকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলবে এবং সরকারের উন্নয়ন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।