
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে দেখার হাওর উপ-প্রকল্পের ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কাটার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রভাবশালী চক্রের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। গত ৮ এপ্রিল বিকেলে উপজেলার শান্তিগঞ্জ বাজারে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা সাংবাদিকদের ‘চাঁদাবাজ’ অপবাদ দিয়ে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেখার হাওর উপ-প্রকল্পের ২৬ নং পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি)-র সভাপতি রায়হান আহমদ ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রশাসনের নাকের ডগায় দুটি বড় এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে হাওরের কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে বিক্রি করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ প্রক্রিয়া চললেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত ৮ এপ্রিল বিকেল ৫টার দিকে বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি এম আর সজীবসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে অবৈধভাবে মাটি কাটার ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় রায়হানের অনুসারীরা সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেয় এবং আলোচনার কথা বলে শান্তিগঞ্জ বাজারে নিয়ে আসে।
সাংবাদিক আব্দুল শহীদ জানান, আমরা মাটি কাটার ভিডিও এবং ছবি সংগ্রহ করে বাজারে চলে আসি। এক পর্যায়ে আমাকে এবং সজীবকে ওয়াল্টন শোরুমে রায়হান নিয়ে যায় এবং চা খাওয়ায়। আমরা বেরিয়ে আসার পর তারা আমাদের উপর আক্রমণ করে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক এম আর সজীব জানান, “আমরা রায়হানের কাছে শুধু জানতে চেয়েছিলাম তিনি মাটি কাটার জন্য প্রশাসন থেকে কোনো অনুমতি নিয়েছেন কি না। এরপর তার লোকজন আমাদের শান্তিগঞ্জ বাজারের একটি শোরুমে বসতে বলে। সেখান থেকে বের হওয়ার পরপরই রায়হান ও তার ক্যাডার বাহিনী আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘চাঁদাবাজ’ বলে চিৎকার শুরু করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আমাদের ওপর হামলা চালায়।”
অন্যদিকে ভুক্তভোগী সুনামকণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার সিনিয়র সাংবাদিক আকরাম উদ্দিন বলেন, রায়হান মিয়া যেখানে এস্কেলেটর মেশিন দিয়ে মাটি কাটে সেখান থেকে দেখে এসে আমি আর প্রীতম সুনামগঞ্জের সময় পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি আবু সাইদের অফিসে বসে চা খাচ্ছিলাম। তখন সাংবাদিক সজীব কল দিয়ে বলে ওয়ালটন শোরুমে যাওয়ার জন্য। আবু সাইদকে সাথে নিয়ে আমি শোরুমে গিয়ে দেখলাম সজীব ও আব্দুল শহীদ বসে তাদের সাথে কথা বলছে। এক পর্যায়ে চা খেয়ে আমি আর প্রীতম বের হয়ে আসি। যাওয়ার প্রস্তুতিক্রমে হঠাৎ তারা চাঁদাবাজ বলে আমাদের উপর আক্রমণ করে। কেন এমন করল কি কারণে করল তা আমরা জানিনা। আমি তার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।
এদিকে সাংবাদিক প্রীতম বলেন, রায়হান শান্তিগঞ্জ উপজেলার মাটি বিক্রেতাদের গডফাদার। সদরপুর ক্লোজার পিআইসির সে সভাপতি, এই সদরপুর ক্লোজারের অনিয়ম ও মাটি বিক্রি নিয়ে আমি পূর্বে সংবাদ প্রকাশ করি। কিন্তু বিগত দিনের ঘটনার কিছুই আমি জানিনা। আমার সাথে সিনিয়র সাংবাদিক আকরাম উদ্দিন ভাই ছিলেন। আমরা বাহিরে অবস্থান করার সময় এমন ঘটনা তৈরি করে রায়হানের ক্যাডার বাহিনী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় এলাকাটিতে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রভাবশালী চক্রটি সাংবাদিকদের পেশাগত সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হেনস্তা করে।
একজন সংবাদকর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সাংবাদিক নেতারা বলছেন, হাওরের পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে মাটি কাটা এবং তা ঢাকতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরার শামিল।
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো জোরালো পদক্ষেপ দেখা না গেলেও, সাংবাদিক সংগঠনগুলো অভিযুক্ত রায়হান ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরের টপ সয়েল বা উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ফেলায় দীর্ঘমেয়াদে ফসলি জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাবে। পিআইসি সভাপতির মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন পরিবেশবিরোধী কাজ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা আইনের চরম লঙ্ঘন।