
মোঃ রেজাউল করিম স্টাফ রিপোর্টার, (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নে যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ সংযোগ না থাকায় এখনো দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ। নোয়াখালী বাজার ও পাথারিয়া বাজারসংলগ্ন দুটি ব্রিজ নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ গ্রামের বাসিন্দাদের যোগাযোগ সংকট কাটেনি।
এর পাশাপাশি গণিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন নদীর পূর্বপাড়ের খেয়াঘাটে সোলার বাতির ব্যাটারি চুরি হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর ঘাটটি অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিনের যাত্রীদের পাশাপাশি নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের রাতের নদী পারাপারে বাড়ছে ঝুঁকি।
স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে শুধু ব্রিজ নির্মাণ নয়, এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক, নিরাপদ ঘাট ও আলোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাথারিয়া বাজারসংলগ্ন ব্রিজের মাধ্যমে আসামমুড়া হয়ে শ্রীনাথপুর ও পুরাতন জাহানপুরের দিকে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে নোয়াখালী বাজারসংলগ্ন ব্রিজের সঙ্গে জামলাবাদ সড়কের সংযোগ রয়েছে।
তবে এর আশপাশে থাকা হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ গ্রামের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগ এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন। ব্রিজ নির্মাণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়কও কি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ ছিল। যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেই সংযোগ পুরোপুরি বাস্তবায়নে বিলম্ব কেন। আর পরিকল্পনায় না থাকলে ব্রিজ নির্মাণের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাবে।
শুষ্ক মৌসুমে বিকল্প পথ ব্যবহার করে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলে তিন গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক পথ দুর্গম হয়ে ওঠে। তখন নৌযান ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয় না।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া, কৃষিপণ্য বাজারজাত করা কিংবা উপজেলা সদরে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত, সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কাছাকাছি এলাকার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হলে শুধু যাতায়াতের সময়ই কমবে না, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
চেয়ারম্যানের আশাবাদ, পূর্ণাঙ্গ সংযোগ হলে বদলে যাবে পূর্বপাড়ের চিত্র
নোয়াখালী বাজার ও পাথারিয়া বাজারসংলগ্ন দুটি ব্রিজ এবং এর সংযোগ সড়ক নিয়ে এলাকাবাসীর প্রত্যাশার বিষয়ে পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামো শক্তিশালী করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই তিনটি গ্রামের সঙ্গে দুটি ব্রিজের পূর্ণাঙ্গ সংযোগ আরও আগেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা প্রয়োজন ছিল। শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলে অল্প দূরত্বের পথও অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়। তখন নৌকা ছাড়া মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
চেয়ারম্যান বলেন, হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ, এই তিনটি গ্রামের সঙ্গে ব্রিজগুলোর পূর্ণাঙ্গ সংযোগ হয়ে গেলে পূর্বপাড়ের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে না, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও আরও গতিশীল হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও আলোর ব্যবস্থা করার বিষয়ে কাজ করেছি। তবে বড় ধরনের উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সমন্বিত উদ্যোগ। এ বিষয়ে মাননীয় এমপি মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক- সামাজিক নেতাকর্মীসহ সবার সহযোগিতা দরকার।
শহিদুল ইসলাম বলেন, দুটি ব্রিজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়কগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করা গেলে কাজের স্থায়িত্ব ও মান, দুটিই নিশ্চিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পূর্বপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আরও বিকশিত হবে।
চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, নোয়াখালী ও পাথারিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রিজের পাশাপাশি গণিগঞ্জ বাজার থেকে নদীর পূর্বপাড়ে একটি ছোট ব্রিজ নির্মাণেরও প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, গণিগঞ্জ বাজার থেকে নদীর পূর্বপাড়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়। এখানে একটি ছোট ব্রিজ করা সম্ভব হলে মানুষের চলাচল অনেক সহজ হবে। বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে পূর্বপাড়ের মানুষের যোগাযোগ আরও সহজ ও নিরাপদ হবে।
তার মতে, পরিকল্পিতভাবে ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা গেলে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থাকে একটি কার্যকর নেটওয়ার্কে পরিণত করা সম্ভব হবে।
যোগাযোগ সংকটের পাশাপাশি গণিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন নদীর পূর্বপাড়ের খেয়াঘাটেও রয়েছে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা। ঘাটে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতির ব্যাটারি চুরি হওয়ার পর থেকে বাতিটি অচল হয়ে আছে। সন্ধ্যার পর ঘাটজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার।
প্রতিদিন শত শত মানুষ এই ঘাট দিয়ে নদী পারাপার করেন। জরুরি প্রয়োজনে রাতেও নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও সাধারণ যাত্রীদের ঘাট ব্যবহার করতে হয়। অন্ধকারে নৌকার জন্য অপেক্ষা করা, নদীর পাড়ে ওঠানামা কিংবা কাদামাটির পথ দিয়ে চলাচলের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু চুরি যাওয়া ব্যাটারি প্রতিস্থাপন নয়, নদীর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাড়ে স্থায়ীভাবে সৌরবিদ্যুৎচালিত আলোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একটি ব্রিজ নির্মাণের পর সেটিকে কার্যকর করতে দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্মিত খেয়াঘাটে নিরাপদ আলো ও চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে অবকাঠামোর পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না।
পাথারিয়া ইউনিয়নের হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, নির্মিত দুটি ব্রিজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে গণিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন নদীর পূর্বপাড়ে একটি ছোট সেতুর সম্ভাব্যতা বিবেচনা করতে হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগে এসব যোগাযোগ সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে। ব্রিজ, সংযোগ সড়ক ও নিরাপদ ঘাট, তিনটি বিষয়কে একই উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনা গেলে নদীর পূর্বপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
তাদের ভাষায়, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের চলাচল ও জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন আনলেই তার পূর্ণ সুফল নিশ্চিত হবে।