
রাজন আবেদীন রাজু, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকার পরও মৌলভীবাজারে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলার সাতটি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়া এ সংক্রমণে এ পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু এবং ২ হাজার ৩১৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে অন্যান্য সংক্রামক ও মৌসুমি রোগের চাপ বাড়তে থাকায় জেলার হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যাসংকট। এতে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জেলাজুড়ে সংক্রমণের বিস্তারের মধ্যে কুলাউড়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় তিনজন করে এবং রাজনগর, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় একজন করে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মৌলভীবাজার সদরের সাইফুল ইসলাম (৪২), শিক্ষক শুয়েব এবং দেওরাছড়া চা বাগানের শ্রমিক সীমা মুণ্ডার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে ১৭১ জনের শরীরে হাম এবং দুজনের শরীরে রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। তবে নিয়মিত টিকা নেওয়ার পরও কিছু মানুষের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে টিকাদান কার্যক্রমের আওতা, টিকার সংরক্ষণব্যবস্থা ও মাঠপর্যায়ের তদারকি নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা। তবে টিকার মান বা সংরক্ষণে ত্রুটি রয়েছে কি না, তা যথাযথ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
মৌলভীবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন জাকির হোসেন জানিয়েছেন, টিকা নেওয়ার পরও কিছু ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশনে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ায় জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে। মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্ধারিত শয্যার বাইরে মেঝে ও বারান্দায় রেখেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
সদর হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর চাপের চিত্রও উদ্বেগজনক। বর্তমানে আইসোলেশন ইউনিটে ২৯ জন শিশু এবং ডেঙ্গু আক্রান্তসহ মোট ৪৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া মেডিসিন ওয়ার্ডে ১০২ জন, শিশু ওয়ার্ডে ৩৭ জন, স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (এসসিএএনইউ)-তে ১৮ জন এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চারজন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ অবস্থায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনাগত দিকগুলো পর্যালোচনা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের অবস্থা যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে চা বাগান ও দুর্গম এলাকার শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা।
পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।