
মোঃ রেজাউল করিম স্টাফ রিপোর্টার, শান্তিগঞ্জ (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নে উন্নয়নের অবকাঠামো থাকলেও তার পূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ। গণিগঞ্জ বাজা রসংলগ্ন নদীর পূর্বপাড়ের খেয়াঘাটে সোলার বাতির ব্যাটারি চুরি হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যা নামলেই ঘাটজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। অন্যদিকে নোয়াখালী বাজার ও পাথারিয়া বাজারসংলগ্ন দুটি ব্রিজ নির্মাণের পরও প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ গ্রামের মানুষের যোগাযোগ দুর্ভোগ কাটছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ ব্যয় হলেও সংশ্লিষ্ট সংযোগ ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ থাকায় বাস্তব সুবিধা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি বৃদ্ধি ও হাওরাঞ্চলের স্বাভাবিক জলাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সঙ্গে যোগাযোগে ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
ব্যাটারি চুরি, অন্ধকারে খেয়াঘাট।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গণিগঞ্জ বাজার থেকে নদীর পূর্বপাড়ের বিভিন্ন গ্রামে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম এই খেয়াঘাট। প্রতিদিন শত শত মানুষ নৌকায় নদী পারাপার করেন। দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যার পরও জরুরি প্রয়োজনে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও সাধারণ যাত্রীদের ঘাট ব্যবহার করতে হয়।
কিন্তু পূর্বপাড়ের খেয়াঘাটে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ চালিত বাতির ব্যাটারি চুরি হওয়ার পর থেকে সেটি অচল হয়ে আছে। ফলে সন্ধ্যা নামলেই ঘাট এলাকা কার্যত অন্ধকারে পরিণত হয়।
অন্ধকারে নৌকার জন্য অপেক্ষা করা, পাড়ে ওঠানামা কিংবা কাদামাটির পথ দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে যাত্রীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বর্ষাকালে নদীর পানি বাড়লে ঘাটে ওঠানামার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত আলো না থাকায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ঘাটের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত আলোর ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুই পাড়ে সোলার বাতির দাবি।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু চুরি যাওয়া ব্যাটারি প্রতিস্থাপন নয়—খেয়াঘাটের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাড়ে স্থায়ীভাবে সৌরবিদ্যুৎ চালিত বাতির ব্যবস্থা করা হোক।
তাদের মতে, সোলার বাতি স্থাপন করা হলে বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই ঘাট এলাকায় পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি ঘাটের পরিবেশও স্বাভাবিক হবে।
ব্রিজ নির্মাণ হলেও কাটেনি যোগাযোগ সংকট,
খেয়াঘাটের অন্ধকারের পাশাপাশি পাথারিয়া ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসম্পূর্ণ সংযোগ সড়ক।
নোয়াখালী বাজার ও পাথারিয়া বাজার থেকে নদীর পূর্বপাড়ের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে দুটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ব্রিজ নির্মাণের পরও প্রয়োজনীয় সব সড়ক সংযোগ কার্যকর না থাকায় প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।
পাথারিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রিজের সংযোগ সড়ক আসামমুড়া হয়ে শ্রীনাথপুর ও পুরাতন জাহানপুরের দিকে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এর পাশে থাকা নতুন জাহানপুর, হাসারচর ও আমদাবাদ এলাকার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ফলে একটি এলাকায় দু’টি ব্রিজ নির্মাণ হলেও তার সঙ্গে আশপাশের জনপদের কার্যকর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি না হওয়ায় পুরো অবকাঠামোর সুফল কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠছে—কোথায় সেই সংযোগ,
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, ব্রিজ নির্মাণের পর যদি ব্রিজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগই পুরোপুরি কার্যকর না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কতটা কমল।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নোয়াখালী ব্রিজের সঙ্গে জামলাবাদ সড়কের সংযোগ রয়েছে। জামলাবাদ গ্রামের দক্ষিণ দিকে শেষমাতা এলাকার পরেই আমদাবাদ, হাসারচর ও নতুন জাহানপুর এলাকা। কিন্তু এসব এলাকার মধ্যে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগের ঘাটতি থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন সড়ক অংশগুলো যুক্ত করে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে এই তিন গ্রামের মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
বর্ষা এলেই বাড়ে ভোগান্তি,শুষ্ক মৌসুমে বিকল্প পথ ব্যবহার করে কোনোভাবে চলাচল করা সম্ভব হলেও বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক পথ হয়ে যায় দুর্গম।
বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সময় ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাছাকাছি এলাকার মধ্যেও সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় অনেক সময় ঘুরপথে যাতায়াত করতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয়—দুটিই বাড়ছে।
উন্নয়ন কি শুধু ব্রিজ নির্মাণেই শেষ।
স্থানীয়দের বক্তব্য, ব্রিজ নির্মাণ নিঃসন্দেহে এলাকার যোগাযোগ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু ব্রিজের দুই প্রান্তে প্রয়োজনীয় সড়ক সংযোগ না থাকলে সেই উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে সংযোগ সড়ক কি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ ছিল না। থাকলে দীর্ঘদিনেও কেন পুরো সংযোগ কার্যকর হলো না। আর সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলে বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ কী।
এলাকাবাসীর মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বিচ্ছিন্ন সড়ক অংশগুলো দ্রুত যুক্ত করা জরুরি। তা না হলে নির্মিত ব্রিজগুলোও অনেকাংশে কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
দ্রুত সমাধান চান ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের দাবি, গণিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন খেয়াঘাটে দ্রুত সোলার বাতির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে নদীর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাড়ে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করে রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি নোয়াখালী ও পাথারিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রিজগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক সম্পন্ন করে হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদ গ্রামের যোগাযোগ সংকট দূর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর মতে, এই সংযোগগুলো পূর্ণাঙ্গ করা গেলে শুধু তিনটি গ্রামের মানুষ নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও খুলে যাবে নতুন সম্ভাবনা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা—উন্নয়ন যেন শুধু ব্রিজ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; তার সঙ্গে সড়ক সংযোগও পূর্ণাঙ্গ হোক। আর রাতের খেয়াঘাট যেন অন্ধকারে না থাকে। নিরাপদ যোগাযোগ ও পূর্ণাঙ্গ সড়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে হাসারচর, নতুন জাহানপুর ও আমদাবাদের মানুষও যেন উন্নয়নের প্রকৃত সুফল পান—এটাই এখন তাদের প্রধান দাবি।