
জয়নগরে ভুয়া বিশেষজ্ঞের জাল: পল্লী চিকিৎসক এখন ‘মাদকের গডফাদা
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নগর বাজারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার এবং অপচিকিৎসার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মোঃ হাবিবুর রহমান হাবিব নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মূলত এল.এম.এ.এফ ও ডিপ্লোমা ইন মেডিসিন (প্যারামেডিক) কোর্স সম্পন্নকারী একজন পল্লী চিকিৎসক হলেও, তিনি নিজেকে পূর্ণাঙ্গ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ রোগীদের সাথে প্রতারণা করে আসছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সরেজমিনে জয়নগর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মোঃ হাবিবুর রহমান হাবিব তার চেম্বারের সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড এবং প্রেসক্রিপশন প্যাডে বড় অক্ষরে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার করছেন। সাধারণ মানুষ তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সূক্ষ্ম কারিগরি বুঝতে না পেরে তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনে করে প্রতারিত হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি কেবল প্রাথমিক চিকিৎসার (First Aid) সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে নিয়মিত জটিল রোগের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে গর্ভবতী নারীদের ডেলিভারি করাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জয়নগর গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, কয়েক বছর আগে হাবিবের ভুল চিকিৎসায় (ডেলিভারির সময়) একজন হিন্দু নারীর মৃত্যু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সামান্য জ্বর-সর্দি বা কাশিতেও রোগীদের শরীরে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। সাধারণ রোগীরা সরল বিশ্বাসে ১০০ টাকা ভিজিট দিয়ে তার কাছে চিকিৎসা নিতে এসে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
চিকিৎসা পেশার আড়ালে হাবিবের বিরুদ্ধে অন্ধকার জগতের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। সম্প্রতি মোহনপুর গ্রামের এক মাদকবিরোধী সভায় স্থানীয় প্রতিনিধি প্রিন্স সোফায়েল প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে, “হাবিব এই এলাকার মাদকের গডফাদার। তিনি মাদক কারবারিদের অর্থায়ন করেন এবং ব্যবসায় অংশীদার হিসেবে থাকেন।” একজন সাধারণ ফার্মাসিস্ট হয়ে অল্প সময়ে বিপুল অর্থ-বিত্ত ও গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন-২০১০ এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, বিএমডিসি নিবন্ধিত এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ নামের আগে ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন লঙ্ঘনে জেল ও অর্থদণ্ডের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। প্যারামেডিক বা এল.এম.এ.এফ সম্পন্নকারীরা মূলত স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পেলেও স্বাধীনভাবে অ্যালোপ্যাথিক ঔষধের প্রেসক্রিপশন লেখার কোনো আইনি এখতিয়ার তাদের নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোঃ হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “আমার ওপর ওঠা সকল অভিযোগ মিথ্যা। তবে নামের আগে ডাক্তার লাগানোটা আমার উচিত হয়নি, এর জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন জানান, “বিএমডিসি নিবন্ধিত চিকিৎসক ছাড়া অন্য কারও ডাক্তার পদবী ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। জয়নগর বাজারের এই বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ জনপদে এ ধরনের হাতুড়ে চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য রুখতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে।