
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো আর একটু সচ্ছলতার আশায় ঘর ছেড়েছিলেন সুনামগঞ্জের একঝাঁক তরুণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই রূপ নিলো চরম ট্র্যাজেডিতে। দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে প্রাণ হারিয়েছেন সুনামগঞ্জের ১০ জন টগবগে যুবক। টানা ছয় দিন খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং সাগরের প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তারা।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে এখন বইছে মাতম। স্বজনদের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলার আমিনুর রহমান, শায়ক মিয়া, মো. আলী, সোহানুর রহমান ও নাঈম। দিরাই উপজেলার চার যুবক হলেন— নুরুজ্জামান সর্দার ময়না, সাহান এহিয়া, সাজিদুর রহমান ও মুজিবুর রহমান। এছাড়াও প্রাণ হারিয়েছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার অভ্র ফাহিম।
সর্বনাশা চুক্তির আড়ালে নিঃস্ব পরিবার:
নিহতদের স্বজনরা জানান, স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছাতে দালালদের সঙ্গে একেকজন ১১ থেকে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন। কেউ শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করেছেন, কেউবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা তুলে দিয়েছেন পাচারকারীদের হাতে। লিবিয়া পৌঁছানোর পর তাদের কয়েক মাস ‘গেমঘর’ নামক বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে তাদের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
নিহত সাহান এহিয়ার ভাই জাকারিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সবাই স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু দালালরা আমার ভাইকে লাশ বানিয়ে দিল। আমরা ১২ লাখ টাকা দিয়েছি, বিনিময়ে পেলাম ভাইয়ের মরদেহ।” একই আর্তনাদ জগন্নাথপুরের নাঈমের ভাই ঝিনুক মিয়ার কণ্ঠেও— “দালালদের বিচার চাই, আর কারো ভাই যেন এভাবে না মরে।”
সুনামগঞ্জ পুলিশের ডিআইও-১ মো. আজিজুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে দিরাই ও জগন্নাথপুরের আটজনের মৃত্যুর খবর তারা নিশ্চিত হতে পেরেছেন। বাকি দুজনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “যেহেতু তারা কোনো বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে যাননি, তাই সরকারিভাবে তথ্য পাওয়া কঠিন হচ্ছে। তবে আমরা প্রতিটি ইউএনও-কে নির্দেশ দিয়েছি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সাথে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে। মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বার্তা সংস্থা এএফপি ও গ্রিস কোস্টগার্ডের তথ্যমতে, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মাঝ সমুদ্রে দিক হারিয়ে টানা ছয় দিন ভাসতে থাকে তারা। চরম অনাহার ও তৃষ্ণায় নৌকার ২২ জন যাত্রী মারা যান। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। গ্রিক পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে।
স্বপ্ন যখন জীবন কেড়ে নেয়, তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল শূন্যতা। সুনামগঞ্জের এই তরুণদের মৃত্যু আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রার ভয়াবহ পরিণতি। ওপারে শান্তিতে থাকুক এই স্বপ্নদ্রষ্টারা, আর বিচারের আওতায় আসুক সেই ঘাতক দালাল চক্র— এটাই এখন এলা
কাবাসীর দাবি।