
গ্রামের রাখাল থেকে কবি—অভিনয় সরকারের জীবনের গল্প সত্যিই এক অবাক করা ঘটনা। সীমাহীন দারিদ্র্য, কঠিন বাস্তবতা আর সংগ্রামের মাঝেও যে স্বপ্ন বেঁচে থাকে, অভিনয় সরকার তার জীবন্ত উদাহরণ। ইতোমধ্যে “হৃদয়ের কথা” ও “কবিতার ডালি”—নামে দুটি কবিতার বই প্রকাশ করে তিনি সংস্কৃতিমনা পাঠকদের কাছ থেকে কুড়িয়েছেন প্রশংসা ও ভালোবাসা।
অনন্য মেধাবী এই তরুণ কবি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়নের হাজারীপুর নোয়াগাঁও গ্রামে। পিতা লনি সরকার একজন কৃষক এবং মাতা খেলন রানী সরকার। তিন ভাই-বোনের মধ্যে অভিনয় সরকার সবার বড়। পিতার উপার্জনই পরিবারটির একমাত্র আয়ের উৎস। জীবিকার তাগিদে বর্তমানে তিনি পরিবারের সঙ্গে একই জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় বসবাস করছেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই তাঁকে মাঠে গরু-ছাগল চরানোর কাজ শুরু করতে হয়। রাখালের কাজের ফাঁকেই চলতে থাকে তাঁর পড়াশোনা ও লেখালেখি। তখন থেকেই কবিতা, ছড়া ও নানা রচনায় নিজের ভাবনা তুলে ধরতে শুরু করেন তিনি।
অভিনয় সরকারের কবিতায় ফুটে উঠেছে হাওরাঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবনসংগ্রাম, সমাজের অসঙ্গতি, অনিয়ম ও অবিচারের চিত্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তিনি নিয়মিত কবিতা, উপন্যাস ও শিক্ষণীয় উক্তি লিখে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বর্তমানে অভিনয় সরকার সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি মদনমোহন কলেজে অধ্যয়নরত। তিনি দ্বাদশ শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করেছেন এবং উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন।
অভিনয় সরকারের গল্প: আরেক সংগ্রামী প্রতিভা
এই লেখার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক হৃদয়স্পর্শী গল্প। সরকারি কর্মকর্তা বিপুল সরকার তাঁর নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করা এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি লেখেন—
একদিন উজান দৌলতপুর থেকে শাল্লা যাওয়ার পথে লালপুর গ্রামের মাঠে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় অভিনয় সরকারের। রাস্তার পাশে বই নিয়ে পড়তে দেখা যায় ছেলেটিকে। দৃশ্যটি তাঁকে বিস্মিত করে। কথা বলতে গিয়ে জানা যায়, অভিনয় সরকার একজন রাখাল, পাশাপাশি একজন মেধাবী ছাত্র। সে ভাটিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
অভিনয় সরকারের বাবা একজন রাখাল, আর মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ—মাথাব্যথার তীব্র যন্ত্রণায় প্রায়ই শয্যাশায়ী। দুই ভাইয়ের মধ্যে অভিনয় সরকার বড়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তাকে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করতে হয়। কখনো কখনো জীবিকার প্রয়োজনে জাফলংয়েও কাজ করতে যায় সে।
আলাপচারিতায় অভিনয় সরকার জানায়, সে ইতোমধ্যে প্রায় ১৫০টির মতো কবিতা লিখেছে। সেদিন সে দুটি কবিতা শুনিয়েছিল, যা শুনে বিপুল সরকার মুগ্ধ হন। টিউশনি করার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু প্রশ্ন করলে অবিনাশ অনর্গল সঠিক উত্তর দেয়—যা তার মেধার পরিচয় বহন করে।বিপুল সরকার লিখেছেন,
“বাংলাদেশের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানও একসময় গরু চরাতেন। অবিনাশও মন দিয়ে পড়াশোনা করলে অবশ্যই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।”
সমাজের প্রতি আহ্বান এই দুটি গল্প আমাদের সমাজের এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে। গ্রামগঞ্জে অভিনয় সরকারের মতো অসংখ্য প্রতিভাবান শিশু-কিশোর রয়েছে, যারা দারিদ্র্য ও অবহেলার কারণে নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ পায় না। বিপলু সরকার সুনামগঞ্জের গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন—
অসহায় কিন্তু মেধাবী সন্তানদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের শিক্ষা ও প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
গ্রামের রাখাল থেকে কবি হয়ে ওঠা অভিনয় সরকার্র মতো সংগ্রামী তরুণরাই আমাদের সমাজের প্রকৃত সম্পদ। তাদের হাত ধরেই একদিন বদলে যেতে পারে আমাদের আগামীর বাংলাদেশ।