
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্ধারণ ও স্থানান্তর নিয়ে চলমান বিতর্কের মাঝে মুখ খুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আবু নঈম শেখ। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) গণিত বিভাগের এই সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ১০-১৫ বছরের ব্যবধানে একটি বিশাল জনপথ গড়ে ওঠে। তাই সুবিপ্রবি নিয়ে বিরোধিতা না করে সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য জানান, সুবিপ্রবি’র আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে বিশ্ববিদ্যালয়টি “দেখার হাওড়”-এর পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই আলোকে ২০২২ সালে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সুনামগঞ্জের তৎকালীন ৬ জন সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক এবং তাঁর সমন্বয়ে ঢাকা ও সুনামগঞ্জে বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে সিলেট অভিমুখে (সুনামগঞ্জ সদর ও শান্তিগঞ্জ মিলিয়ে) ১২৫ একর জমি অধিগ্রহণের একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়। সরকারি অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত একটি সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই এই জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ পাতায় এই প্রকল্পের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল এবং প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৩৫ কোটি টাকা (কম-বেশি)। বর্তমানে প্রকল্পটি একনেক (ECNEC) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে তিনি জানান।
ক্যাম্পাসের স্থান নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগের জবাবে ড. আবু নঈম শেখ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, বিগত সময়ে নির্বাচিত ৬ জন এমপি যে স্থানটি নির্ধারণ করেছিলেন, সেখানে হাওড়ের জীববৈচিত্র্যের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না—যা সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility study)-তেই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, সুনামগঞ্জ পুরোটাই হাওড় এলাকা এবং এই হাওড়ের মধ্য দিয়েই জেলার সব উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে চলছে। উন্নয়নের ভালো-মন্দ দুই দিকই থাকে (Every development has its pros and cons) উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুবিপ্রবি’র কারণে একসময় সুনামগঞ্জ থেকে পাগলা পর্যন্ত এলাকাটি শহরে রূপান্তর হবে।
স্থানান্তর দাবির বিরোধিতা করে সাবেক এই উপাচার্য দেশের বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে বলেন—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাবিপ্রবি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই মূল জেলা বা বিভাগীয় শহর থেকে বেশ দূরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শহর থেকে ১০, ১৫ বা ২০ কিলোমিটার দূরে হলেও সময়ের ব্যবধানে ক্যাম্পাসগুলোকে কেন্দ্র করে চারপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে আধুনিক উপশহর বা জনপথ সৃষ্টি হয়েছে। সুবিপ্রবি’র ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
দায়িত্ব পালনকালীন অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে অধ্যাপক আবু নঈম শেখ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে ৪-৫ মাস কোনো বাজেট বা গাড়ি ছিল না, এমনকি তিনি বেতনও পাননি। ব্যক্তিগত অর্থ খরচ করে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক কাজ এগিয়ে নিতে হয়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, সে সময় কিছু ‘সুশীল সমাজ’ ও সংবাদকর্মী তাঁর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন প্রচারণা ও মানববন্ধন করেছিলেন। উপাচার্য পদটির মর্যাদা এখন আর আগের মতো নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, অনেকেই এই পদটিকে স্কুল-কলেজের প্রধান শিক্ষক বা প্রিন্সিপালের মতো মনে করেন, যা দুঃখজনক। প্রাথমিক, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত পার্থক্য না বুঝে অনেকেই মন্তব্য করেন।
তিনি স্পষ্ট করেন, উপাচার্য চাইলেই আইনের বাইরে কিছু করতে পারেন না। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল বা নিয়োগ কমিটি কীভাবে গঠিত হবে—তা সংসদ থেকে পাস হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেই স্পষ্ট বলা আছে। এছাড়া উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ার, এতে উপাচার্যের কোনো হাত থাকে না।
পরিশেষে সাবেক এই উপাচার্য বলেন, প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে সুবিপ্রবি’র প্রতি তাঁর অন্যরকম এক টান আমৃত্যু থাকবে। সুবিপ্রবি সুনামগঞ্জের সম্পদ এবং এর সুফল স্থানীয় মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগ করবে। তাই এই বিতর্ক এড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে তিনি তাঁর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
তিনি সুবিপ্রবির সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করেন।