
আহমেদ হেলাল জগদল থেকে ফিরে:
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার একটি ইউনিয়ন—জগদল। ভৌগোলিক মানচিত্রে এর অবস্থান কালনী ও হেরাচ্যাপ্টি নদীর মোহনায়, আর বুক চিরে বয়ে গেছে সুবিশাল চ্যাপ্টার হাওর। উর্বর পলিমাটির এই জনপদে সোনার ফসল ফলে, মানুষের পায়ের নিচে শক্ত মাটিও আছে; কিন্তু নেই শুধু চলার মতো একটি আধুনিক রাস্তা। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে পড়ে থাকা এই ইউনিয়নটি এখন ‘রাস্তাহীন এক জনপদ’ হিসেবে পরিচিত।
স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও মেলেনি সড়ক দেশের কোণায় কোণায় যখন ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের ছোঁয়া লেগেছে, তখন জগদল ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে উন্নয়নের চাকা যেন থমকে আছে এক জায়গায়। স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকে অদ্যবধি এই ইউনিয়নের প্রধান সমস্যা—যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। বর্ষায় থৈ থৈ পানি আর শুকনা মৌসুমে মাইলের পর মাইল ধূ ধূ মরুভূমির মতো পথ পাড়ি দেওয়াই এখানকার মানুষের নিয়তি। স্থানীয়দের আক্ষেপ, “ভোট আসে, ভোট যায়; কিন্তু আমাদের কপালে একটি পাকা রাস্তা জোটে না।
চ্যাপ্টার হাওর ও দুই নদীর মোহনায় বন্দি জীবন
জগদল ইউনিয়নের অবস্থান কালনী ও হেরাচ্যাপ্টি নদীর তীরে। চ্যাপ্টার হাওর পাড়ের হাজার হাজার মানুষের জীবন এই নদী ও হাওরের প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ভৌগোলিক অবস্থানই যেন তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বড় সংযোগ সড়ক না থাকায়:
কৃষির লোকসান: কৃষকরা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ধান ফলালেও রাস্তা না থাকায় তা বাজারে নিতে নৌকা বা মাথায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে পরিবহন খরচেই লাভের বড় অংশ চলে যায়।
চিকিৎসা সংকট: প্রসূতি মা কিংবা জরুরি কোনো রোগী নিয়ে উপজেলা সদরে যাওয়া এক দুঃস্বপ্নের নাম। রাস্তার অভাবে সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে অনেকেরই পথিমধ্যে করুণ মৃত্যু ঘটে।
শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া: ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক বা উচ্চ শিক্ষার জন্য উপজেলা সদরের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত করতে পারে না।
নদী ভাঙন নেই, আছে অবহেলার ক্ষত আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক হাওরাঞ্চল নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেলেও জগদলে নদী ভাঙন কোনো বড় সমস্যা নয়। অর্থাৎ এখানকার ভূখণ্ড স্থিতিশীল। অথচ স্থিতিশীল এই মাটিতে একটি টেকসই সড়ক নির্মাণের কোনো জোরালো উদ্যোগ গত পাঁচ দশকে নেওয়া হয়নি। কালনী ও হেরাচ্যাপ্টি নদীর তীরবর্তী এই জনপদটি যেন নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরেই রয়ে গেছে- উন্নয়ন বঞ্চিত মানুষের দাবি
জগদল ইউনিয়নের সচেতন নাগরিক ও তরুণ প্রজন্মের দাবি, “আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী উন্নয়ন চাই।” তাদের মতে, দিরাই উপজেলা সদরের সাথে জগদলের একটি ‘অল ওয়েদার রোড’ (সারা বছর চলাচলযোগ্য সড়ক) নির্মাণ করলে বদলে যাবে পুরো এলাকার চিত্র। কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার নতুন দুয়ার খুলে যাবে।
পায়ের নিচে শক্ত মাটি থাকলেও সেই মাটিতে চলার মতো মসৃণ পথ না থাকা একবিংশ শতাব্দীতে এক বড় পরিহাস। জগদল ইউনিয়নের মানুষ আর কতকাল এই ‘রাস্তাহীন’ বাস্তবতায় বন্দি থাকবে? চ্যাপ্টার হাওর পাড়ের মানুষের এই নীরব কান্না কি পৌঁছাবে নীতিনির্ধারকদের কানে? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করা বাংলাদেশে জগদল ইউনিয়নের এই চিত্র পরিবর্তনের জন্য এখন একটি মহাপরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।