
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাসারচর গ্রামের শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম (৪৫)-এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জাহানপুর গ্রামে গাছ কাটতে গিয়ে কয়েকদিন আগে তার মৃত্যু হলেও ঘটনাটিকে ঘিরে উঠেছে অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং টাকার বিনিময়ে রফাদফার গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের নীরবতা এবং গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার আগের দিন সাবেক মেম্বার হুসাইন সিরাজুল ইসলামকে ৫০০ টাকা অগ্রিম দিয়ে গাছ কাটার কাজ ঠিক করেন। তবে ঘটনার দিন সকালে সিরাজুল ইসলাম অসুস্থ বোধ করেন এবং কাজে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিবারের সদস্যদের সামনেই তিনি নাকি বলেন, “আজ আমার মন মানছে না, শরীরটাও ভালো লাগছে না।” তবুও অগ্রিম টাকা নেওয়ার অজুহাতে তাকে জোর করে কাজে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—একজন অসুস্থ শ্রমিককে কেন জোর করে কাজে নেওয়া হলো? বিষয়টি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অবহেলা বা দায় রয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে আহত হওয়ার পরও সিরাজুল ইসলামকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তাকে ঘটনাস্থলেই ফেলে রাখা হয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া হলে হয়তো তার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল।
এখন এলাকাবাসীর প্রশ্ন—দুর্ঘটনার পর কেন দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি? কে বা কারা তাকে হাসপাতালে নিতে বিলম্ব করেছে? এই বিলম্বের পেছনে কোনো গাফিলতি বা উদ্দেশ্যমূলক আচরণ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
এদিকে আরেকটি অভিযোগকে ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে নিহত সিরাজুল ইসলামের কোনো বৈধ অভিভাবক উপস্থিত না থাকলেও আব্দুল মতিন নামে এক ব্যক্তি লাশ ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কীভাবে অন্য কেউ লাশ গ্রহণ করলেন—এ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজাম উদ্দিন ও মাওলানা নুরুল মুত্তাকিনের উদ্যোগে কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই দ্রুত লাশ দাফন করা হয়। সাধারণত অস্বাভাবিক বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই ঘটনায় তা না করেই তড়িঘড়ি করে দাফন সম্পন্ন করায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।
ঘটনার পর নিহতের ছোট ভাই ফয়জুল ইসলামের ভূমিকাও এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত হুসাইন মেম্বারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় তিনি বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করছেন। গ্রামবাসীর একটি অংশের দাবি, ফয়জুল ইসলামকে সামনে রেখে প্রভাবশালী মহলের মধ্যস্থতায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পুরো ঘটনাটি রফাদফার চেষ্টা চলছে।
এলাকায় ইতোমধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে ঘটনাটি আইনি তদন্তের বাইরে রাখার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। সচেতন মহলের মতে, একজন শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসায় বিলম্ব, ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন এবং টাকার বিনিময়ে আপসের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া সিরাজুল ইসলামের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা কঠিন হবে। তাই তারা দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।