
চন্ডিডহরের কান্না: তিন মোহনায় একটি ব্রিজের অভাবে থমকে আছে লাখো মানুষের জীবনযাত্র
হেলাল আহমেদ দিরাই সুনামগঞ্জ থেকে ::
সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘চন্ডিডহর’ কোনো সাধারণ ভৌগোলিক নাম নয়, বরং এক সীমাহীন বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। একদিকে দিরাই, অন্যদিকে জগন্নাথপুর আর পাশে শান্তিগঞ্জ—তিন উপজেলার মোহনায় বয়ে চলা নদীর স্রোত যেন এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নগুলোকে প্রতিনিয়ত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটি মাত্র ব্রিজের অভাবে আজও মধ্যযুগীয় যাতায়াত ব্যবস্থার অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন কয়েক লাখ মানুষ।
যেখানে উন্নয়নের চাকা থমকে যায়
সুনামগঞ্জ জেলার উন্নয়নের মহাসড়ক যখন বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত হচ্ছে, তখন চন্ডিডহর মোহনাটি যেন এক “বিচ্ছিন্ন দ্বীপ” হয়ে পড়ে আছে। জগদল, দিরাই, জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার কয়েকশ গ্রামের মানুষ একে অপরের সাথে সরাসরি যুক্ত হতে পারছেন না শুধুমাত্র এই একটি পয়েন্টে ব্রিজ না থাকার কারণে।
বাস্তবতার নিষ্ঠুর চিত্র:
রোগী ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ
সরেজমিনে দেখা যায়, চন্ডিডহরের এই পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হন।
মুমূর্ষু রোগীর জীবন ঝুঁকি: স্থানীয়রা আক্ষেপ করে বলেন, “এখানে কোনো মানুষের হার্ট অ্যাটাক বা প্রসব বেদনা শুরু হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া এক মহাযুদ্ধের নাম। নদী পার হতেই অনেক সময় রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে।”
শিক্ষা জীবনের প্রতিবন্ধকতা: নদী পারাপারের ভোগান্তির ভয়ে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের দূরবর্তী ভালো স্কুল-কলেজে পাঠাতে সাহস পান না। বর্ষাকালে উথাল-পাথাল ঢেউয়ে নৌকা পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা
ভাটির এই অঞ্চলটি কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ। কিন্তু চন্ডিডহর ব্রিজ না থাকায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। পরিবহনের অভাবে পণ্য বাজারে নিতে খরচ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফলে কঠোর পরিশ্রম করেও অভাব কাটছে না এই জনপদের মানুষের।
”আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা শুনি, কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না। নদী পাড়ে এসে যখন দাঁড়াই, তখন মনে হয় আমরা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজ্যে বাস করছি। একটি ব্রিজ হলে আমাদের জীবনের চেহারা পাল্টে যেত।” — বলছিলেন চন্ডিডহর পাড়ের একজন হতাশ কৃষক।
আর কত প্রতীক্ষা?
নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। প্রার্থীরা চন্ডিডহর ব্রিজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে যান, কিন্তু ভোটের পর সেই প্রতিশ্রুতি আর আলোর মুখ দেখে না। এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি—এটি কেবল একটি ব্রিজ নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার অধিকার। শান্তিগঞ্জ, দিরাই ও জগন্নাথপুরের এই মিলনস্থলে একটি পরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণ করা হলে পুরো সুনামগঞ্জের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
ভাটির জনপদের এই লাখো মানুষের আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাস কি পৌঁছাবে প্রশাসনের কানে? নাকি আরও কয়েক দশক নদী পাড়েই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে চন্ডিডহরের বাসিন্দাদের?